এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে তৈরি এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। আমবাতের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, গলা বা জিভ ফুলে যাওয়া, ঢোক গিলতে কষ্ট, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান ভাব হলে এটি জরুরি অবস্থা — দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।
হঠাৎ চাকা চাকা ফুলে ওঠা: আমবাত আসলে কী
গোসল সেরে বা খাওয়ার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ দেখা গেল শরীরের কোথাও লাল বা ত্বকের রঙের ফোলা চাকা, প্রচণ্ড চুলকানি, আর কয়েক ঘণ্টা পর সেই চাকা মিলিয়ে গিয়ে অন্য জায়গায় নতুন চাকা। অনেকে একে “এলার্জি উঠেছে” বলেন, গ্রামে কেউ কেউ বলেন “পিত্ত উঠেছে” বা “শীতপিত্ত”। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর নাম আর্টিকেরিয়া (Urticaria), বাংলায় আমবাত।
আমবাত খুবই সাধারণ সমস্যা। জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনেক মানুষেরই অন্তত একবার এটি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি মাসের পর মাস চলতে থাকে, আবার কখনো কখনো এটি একটি গুরুতর অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়ার প্রথম সংকেত হতে পারে। তাই কোন আমবাত সাধারণ আর কোনটি জরুরি, সেই পার্থক্য জানা জরুরি।
ত্বকের ভেতরে কী ঘটে
ত্বকে মাস্ট সেল নামের এক ধরনের কোষ থাকে। কোনো উদ্দীপনা পেলে এই কোষগুলো হিস্টামিনসহ কিছু রাসায়নিক পদার্থ ছাড়ে। হিস্টামিন ত্বকের ছোট রক্তনালিগুলোকে প্রসারিত করে এবং সেগুলো থেকে তরল বেরিয়ে আশপাশের টিস্যুতে জমে। ফলে ত্বক ফুলে ওঠে, লাল হয় এবং তীব্র চুলকায়।
এই ফোলা চাকাকে বলা হয় “হুইল” (wheal)। আমবাতের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি আলাদা চাকা সাধারণত ২৪ ঘণ্টার কম সময় থাকে এবং মিলিয়ে যাওয়ার পর ত্বকে কোনো দাগ রেখে যায় না। একটি চাকা মিলিয়ে গেলেও নতুন চাকা অন্য জায়গায় উঠতে পারে, তাই মনে হয় সমস্যাটি সারাদিন চলছে।
কখনো কখনো ফোলা ত্বকের আরও গভীর স্তরে হয়। তখন চোখের পাতা, ঠোঁট, গাল, হাত-পা বা যৌনাঙ্গ ফুলে যায়, চুলকানির চেয়ে টান টান বা জ্বালা ভাব বেশি থাকে। একে বলা হয় অ্যানজিওইডিমা (Angioedema)। এটি আমবাতের সঙ্গে বা আলাদাভাবে হতে পারে। জিভ, গলা বা শ্বাসনালিতে ফোলা হলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।
আমবাতের ধরন: সময় দিয়ে ভাগ
চিকিৎসকেরা আমবাতকে প্রধানত সময়কাল দিয়ে ভাগ করেন, কারণ কারণ খোঁজা ও চিকিৎসার পরিকল্পনা এর ওপর নির্ভর করে।
- অ্যাকিউট (তীব্র) আমবাত: ছয় সপ্তাহের কম সময় থাকে। সবচেয়ে সাধারণ ধরন। অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, যেমন সাম্প্রতিক ভাইরাস সংক্রমণ, নতুন কোনো ওষুধ বা খাবার।
- ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী) আমবাত: ছয় সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিন বা মাঝে মাঝে চলতে থাকে। এর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাইরের কোনো নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না; একে বলা হয় ক্রনিক স্পনটেনিয়াস আর্টিকেরিয়া। ধারণা করা হয়, এতে শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি ভূমিকা থাকে।
এ ছাড়া কিছু আমবাত নির্দিষ্ট শারীরিক উদ্দীপনায় ওঠে। এগুলোকে বলা হয় ইনডিউসিবল বা ফিজিক্যাল আর্টিকেরিয়া।
- ডার্মোগ্রাফিজম: নখ দিয়ে ত্বকে আঁচড় দিলে বা টাইট কাপড়ের চাপে সেই রেখা বরাবর ফুলে ওঠা। অনেকে বলেন, “ত্বকে লিখলে লেখা ফুটে ওঠে।”
- কোলিনার্জিক আর্টিকেরিয়া: ব্যায়াম, গরম পানিতে গোসল, ঝাল খাবার বা মানসিক চাপে শরীর গরম হলে ছোট ছোট অনেক দানা। বাংলাদেশের গরমে এটি বেশ পরিচিত।
- ঠান্ডাজনিত আমবাত: ঠান্ডা পানি, ঠান্ডা বাতাস বা ঠান্ডা পানীয়ের সংস্পর্শে। এই ধরনে ঠান্ডা পানিতে সাঁতার কাটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তাই চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা জরুরি।
- চাপজনিত আমবাত: ব্যাগের ফিতা, বেল্ট বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার জায়গায় কয়েক ঘণ্টা পর গভীর, ব্যথাযুক্ত ফোলা।
- রোদজনিত আমবাত: রোদে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে খোলা ত্বকে চাকা। এটি তুলনামূলক বিরল।
কী কী কারণে আমবাত হতে পারে
অ্যাকিউট আমবাতের সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- সংক্রমণ: সর্দি-কাশি, গলাব্যথা, পেটের ভাইরাস বা অন্য সংক্রমণ। শিশুদের আমবাতের অন্যতম সাধারণ কারণ ভাইরাস সংক্রমণ। এ ক্ষেত্রে খাবারকে দায়ী করে অপ্রয়োজনে খাদ্যতালিকা ছোট করা হয়।
- ওষুধ: কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক (NSAID), কিছু রক্তচাপের ওষুধ। NSAID অনেকের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমবাতকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
- খাবার: চিংড়ি ও অন্যান্য খোলসযুক্ত সামুদ্রিক খাবার, ডিম, দুধ, বাদাম, কিছু ফল। খাবারজনিত সত্যিকারের অ্যালার্জিতে সাধারণত খাওয়ার কয়েক মিনিট থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়।
- পোকার কামড় ও হুল: মৌমাছি, বোলতা, ভীমরুল, পিঁপড়া। পোকার কামড় ও স্ক্যাবিসের পার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত আছে আমাদের পোকার কামড় বিষয়ক লেখায়।
- ত্বকের সংস্পর্শ: কিছু গাছের পাতা, ল্যাটেক্স, প্রাণীর লালা বা লোম।
ক্রনিক আমবাতের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় বাইরের কোনো একক কারণ পাওয়া যায় না। তবে মানসিক চাপ, NSAID, অ্যালকোহল, গরম ও টাইট কাপড় লক্ষণ বাড়িয়ে দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে থাইরয়েডের অটোইমিউন সমস্যার সঙ্গে ক্রনিক আমবাতের সম্পর্ক দেখা যায়, তাই চিকিৎসক প্রয়োজনে কিছু রক্ত পরীক্ষা করতে পারেন।
এটি কি আমবাত, নাকি অন্য কিছু?
অনেক চুলকানিযুক্ত র্যাশকেই মানুষ “এলার্জি” বলেন। কিন্তু আমবাতের কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে।
| বৈশিষ্ট্য | আমবাত | অন্য সমস্যার সম্ভাবনা |
|---|---|---|
| একটি চাকা কতক্ষণ থাকে | সাধারণত ২৪ ঘণ্টার কম | একই দাগ দিনের পর দিন থাকলে একজিমা, দাদ, সোরিয়াসিস বা অন্য কিছু |
| মিলিয়ে যাওয়ার পর | দাগ থাকে না | কালচে বা বেগুনি দাগ, ক্ষত বা আঁশ থাকলে অন্য কারণ |
| উপরিভাগ | মসৃণ, ফোলা; আঁশ বা ফোসকা নেই | আঁশ, খসখসে ভাব বা ফোসকা থাকলে অন্য রোগ |
| চুলকানির সময় | যেকোনো সময় | রাতে তীব্র এবং পরিবারের অন্যদেরও হলে স্ক্যাবিস |
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হলো: যদি একটি একক চাকা ২৪ ঘণ্টার বেশি থাকে, চুলকানির চেয়ে ব্যথা বা জ্বালা বেশি হয়, এবং মিলিয়ে যাওয়ার পর কালশিটের মতো দাগ রেখে যায়, তাহলে এটি সাধারণ আমবাত না-ও হতে পারে। রক্তনালির প্রদাহজনিত একটি অবস্থা (আর্টিকেরিয়াল ভাস্কুলাইটিস) এমনভাবে দেখা দিতে পারে, যা চিকিৎসকের মূল্যায়ন দাবি করে।
কখন আমবাত জরুরি অবস্থা
আমবাত নিজে বেশিরভাগ সময় বিপজ্জনক নয়। কিন্তু এটি অ্যানাফাইল্যাক্সিস নামের একটি মারাত্মক, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়ার অংশ হতে পারে। নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিন:
- শ্বাস নিতে কষ্ট, বুকে চাপ বা শোঁ শোঁ শব্দ
- জিভ, ঠোঁট বা গলা ফুলে যাওয়া, কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়া, ঢোক গিলতে কষ্ট
- মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, অজ্ঞান ভাব বা রক্তচাপ কমে যাওয়ার অনুভূতি
- বমি, পেটে তীব্র ব্যথা বা পাতলা পায়খানা, বিশেষত পোকার হুল বা নতুন খাবার-ওষুধের পর
- খুব অল্প সময়ের মধ্যে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া র্যাশ
এমন অবস্থায় বাড়িতে ঘরোয়া প্রতিকার বা চুলকানির লোশন দিয়ে সময় নষ্ট করা বিপজ্জনক। আগে কখনো অ্যানাফাইল্যাক্সিস হয়ে থাকলে চিকিৎসক ভবিষ্যতের জন্য একটি জরুরি পরিকল্পনা দিতে পারেন।
চিকিৎসা: চিকিৎসক সাধারণত কী বিবেচনা করেন
আমবাতের চিকিৎসার লক্ষ্য দুটি: উদ্দীপক কারণ থাকলে তা এড়ানো, এবং লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা।
অ্যান্টিহিস্টামিন: আমবাতের প্রধান চিকিৎসা হলো অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ, যা হিস্টামিনের প্রভাব আটকে চুলকানি ও ফোলা কমায়। আধুনিক নির্দেশিকায় সাধারণত কম ঘুম-ঘুম ভাব তৈরি করে এমন (দ্বিতীয় প্রজন্মের) অ্যান্টিহিস্টামিনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কোন ওষুধ, কত মাত্রায় এবং কতদিন খাবেন, তা আপনার বয়স, অন্য রোগ, গর্ভাবস্থা বা স্তন্যদান এবং অন্যান্য ওষুধের ওপর নির্ভর করে। তাই এটি চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে ঠিক করুন এবং প্যাকের নির্দেশনা মেনে চলুন। পুরনো ধরনের কিছু অ্যান্টিহিস্টামিন ঘুম ঘুম ভাব আনে, তাই সেগুলো খেয়ে গাড়ি চালানো বা যন্ত্র চালানো ঝুঁকিপূর্ণ।
স্টেরয়েড: তীব্র আমবাতে চিকিৎসক কখনো কখনো স্বল্প সময়ের জন্য মুখে খাওয়ার স্টেরয়েড দিতে পারেন। কিন্তু নিজে থেকে বা দোকানের পরামর্শে বারবার স্টেরয়েড খাওয়া বা ইনজেকশন নেওয়া নিরাপদ নয়। দীর্ঘমেয়াদি স্টেরয়েডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আছে আমাদের প্রেসক্রিপশন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিষয়ক লেখায়। আমবাতে গায়ে স্টেরয়েড ক্রিম লাগানো সাধারণত খুব একটা কাজে আসে না, কারণ সমস্যাটি ত্বকের গভীরে এবং চাকাগুলো জায়গা বদলায়।
ক্রনিক আমবাতের চিকিৎসা: দীর্ঘস্থায়ী আমবাতে চিকিৎসক ধাপে ধাপে চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষায়িত ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এই সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই চর্মরোগ বা অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে নিতে হয়।
ঘরে কী করবেন: লক্ষণ কমানোর নিরাপদ অভ্যাস
- ঠান্ডা সেঁক: পরিষ্কার কাপড়ে মোড়ানো ঠান্ডা পানির সেঁক চুলকানি কিছুটা কমাতে পারে। তবে ঠান্ডাজনিত আমবাত থাকলে এটি এড়িয়ে চলুন।
- ঢিলেঢালা সুতির কাপড়: টাইট জিন্স, বেল্ট বা সিনথেটিক কাপড় চাপ ও ঘাম দুটোই বাড়ায়।
- গোসলে কুসুম গরম পানি: খুব গরম পানি হিস্টামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে চুলকানি বাড়াতে পারে।
- চুলকানো কমান: চুলকালে আরও ফোলে এবং ত্বকে ক্ষত হয়। নখ ছোট রাখুন।
- উদ্দীপক এড়ান: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক এড়িয়ে চলুন যদি এগুলোতে আমবাত বাড়ে। অ্যালকোহল এড়ানো ভালো।
- একটি ডায়েরি রাখুন: কখন উঠল, তার আগে কী খেয়েছিলেন, কোন ওষুধ নিয়েছিলেন, কোথায় ছিলেন, ব্যায়াম বা গরমে ছিলেন কি না। ছবি তুলে রাখুন, কারণ ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় চাকা মিলিয়ে যেতে পারে।
ক্যালামাইন লোশন ত্বকের উপরিভাগ ঠান্ডা করে কিছু মানুষকে সাময়িক আরাম দিতে পারে। আমাদের Itching Relief Lotion ক্যালামাইনভিত্তিক একটি লোশন, যা এর প্রোডাক্ট তথ্য অনুযায়ী হালকা অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, পোকার কামড় ও ঘামাচিসহ বিভিন্ন কারণের চুলকানিতে আরাম দেওয়ার জন্য তৈরি। তবে মনে রাখবেন, ক্যালামাইন শুধু চুলকানির উপসর্গ সামলায়; এটি আমবাতের কারণ বা ভেতরের হিস্টামিন প্রতিক্রিয়া বন্ধ করে না, এবং অ্যানাফাইল্যাক্সিসে এর কোনো ভূমিকা নেই। ক্যালামাইন কী করে আর কী করে না, তা নিয়ে বিস্তারিত আছে আমাদের ক্যালামাইন লোশন বিষয়ক লেখায়।
প্রচলিত ভুল ধারণা
“আমবাত মানেই খাবারের এলার্জি।” বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ অনেক বেশি সাধারণ কারণ। প্রমাণ ছাড়া একের পর এক খাবার বাদ দিলে শিশুর পুষ্টির ক্ষতি হতে পারে। খাবার সন্দেহ হলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
“ইলিশ, বেগুন বা গরুর মাংস খেলেই আমবাত বাড়ে।” কিছু মানুষের নির্দিষ্ট খাবারে প্রতিক্রিয়া হতে পারে, কিন্তু সবার জন্য একটি সাধারণ “নিষিদ্ধ তালিকা” বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়। আপনার ডায়েরিতে বারবার একই খাবারের পর আমবাত দেখা গেলে তা চিকিৎসককে জানান।
“আমবাত ছোঁয়াচে।” না। আমবাত একজন থেকে আরেকজনে ছড়ায় না। তবে এর পেছনে থাকা কোনো ভাইরাস সংক্রমণ ছোঁয়াচে হতে পারে।
“অ্যালার্জি টেস্ট করালেই কারণ বের হবে।” ক্রনিক স্পনটেনিয়াস আমবাতে সাধারণ অ্যালার্জি প্যানেল টেস্ট প্রায়ই কারণ খুঁজে দেয় না এবং বিভ্রান্তিকর ফলও দিতে পারে। কোন পরীক্ষা দরকার, তা চিকিৎসক আপনার ইতিহাস শুনে ঠিক করবেন।
“একবার স্টেরয়েড ইনজেকশন নিলেই চিরতরে সেরে যাবে।” স্টেরয়েড সাময়িকভাবে লক্ষণ কমালেও ক্রনিক আমবাত সারায় না, এবং বারবার নিলে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে।
বিশেষ পরিস্থিতি
শিশু: শিশুদের আমবাত প্রায়ই ভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে আসে এবং নিজে থেকে সেরে যায়। তবে শিশুর ঠোঁট বা মুখ ফুলে গেলে, শ্বাসকষ্ট হলে, খুব নিস্তেজ হয়ে পড়লে বা উচ্চ জ্বর থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। শিশুর জন্য যেকোনো ওষুধের মাত্রা ওজন ও বয়স অনুযায়ী চিকিৎসক ঠিক করবেন।
গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদান: এই সময়ে নিজে থেকে কোনো অ্যান্টিহিস্টামিন বা অন্য ওষুধ শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ঠোঁট বা চোখ ফোলা কিন্তু চুলকানি নেই: চুলকানি ছাড়া বারবার ঠোঁট, জিভ বা মুখ ফোলা হলে এবং আপনি রক্তচাপের কোনো ওষুধ খান, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই চিকিৎসককে জানান, কারণ কিছু রক্তচাপের ওষুধ চুলকানি ছাড়াই অ্যানজিওইডিমা ঘটাতে পারে। নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করবেন না।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
আমবাত কতদিনে সারে?
অ্যাকিউট আমবাত সাধারণত কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহে সেরে যায়। ছয় সপ্তাহের বেশি চললে একে ক্রনিক ধরা হয়। ক্রনিক আমবাতও অনেকের ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে কমে আসে, তবে কতদিন লাগবে তা আগে থেকে বলা যায় না।
রাতে আমবাত বেশি হয় কেন?
রাতে শরীরের তাপমাত্রা ও কিছু হরমোনের মাত্রা বদলায়, আর দিনের ব্যস্ততা না থাকায় চুলকানি বেশি টের পাওয়া যায়। কম্বল বা ভারী কাপড়ে শরীর গরম হলেও বাড়তে পারে।
আমবাতে কি গোসল করা যাবে?
হ্যাঁ। কুসুম গরম বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে গোসল করুন, খুব গরম পানি এড়িয়ে চলুন, এবং ঘষে ঘষে না মুছে আলতো করে শুকান।
ঘামলে বা ব্যায়াম করলে ছোট ছোট দানা ওঠে, কী করব?
এটি কোলিনার্জিক আর্টিকেরিয়ার বৈশিষ্ট্য হতে পারে। ঠান্ডা পরিবেশে ব্যায়াম, হালকা কাপড় ও ধীরে ধীরে ব্যায়ামের তীব্রতা বাড়ানো সহায়ক হতে পারে। ব্যায়ামের সময় শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরা হলে অবশ্যই চিকিৎসককে জানান।
গরমে ওঠা ঘামাচি আর আমবাত কি একই?
না। ঘামাচি হয় ঘামের নালি বন্ধ হয়ে, সাধারণত ছোট ছোট দানা হিসেবে, এবং ঠান্ডা পরিবেশে থাকলে ধীরে ধীরে কমে। বিস্তারিত আছে আমাদের ঘামাচি বিষয়ক লেখায়।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
- জরুরি ভিত্তিতে: শ্বাসকষ্ট, জিভ বা গলা ফোলা, কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়া, ঢোক গিলতে কষ্ট, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান ভাব
- নতুন কোনো ওষুধ শুরুর পর আমবাত দেখা দিলে (নিজে থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ বন্ধ না করে দ্রুত প্রেসক্রাইবারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন)
- আমবাতের সঙ্গে জ্বর, গাঁটে ব্যথা, ওজন কমা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি
- একটি চাকা ২৪ ঘণ্টার বেশি থাকলে, ব্যথা করলে বা কালশিটের মতো দাগ রেখে গেলে
- ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আমবাত চললে
- চুলকানিতে ঘুম, কাজ বা পড়াশোনা ব্যাহত হলে
- বারবার ঠোঁট, চোখ বা মুখ ফুলে গেলে, চুলকানি থাকুক বা না থাকুক
- গর্ভাবস্থায়, শিশুর ক্ষেত্রে বা আগে থেকে দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে
কোন লক্ষণে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানো উচিত, সে বিষয়ে আরও জানতে পড়ুন আমাদের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানোর লক্ষণ বিষয়ক গাইড।
